1. [email protected] : admi2019 :
| বঙ্গাব্দ

নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে মাইনের মৃত্যু ফাঁদ

রিপোর্টারের নামঃ Shahjalal Rana
  • আপডেট টাইমঃ 11-06-2026 ইং
  • 81 বার পঠিত
ad728

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। পাহাড়ি কলাবাগানে প্রতিদিনের মতো কাজে ব্যস্ত ছিলেন কয়েকজন শ্রমিক।

কেউ আগাছা পরিষ্কার করছেন, কেউ গাছের গোড়া পরিচর্যা করছেন। হঠাৎ করেই বিকট এক বিস্ফোরণ। মুহূর্তেই কেঁপে ওঠে পুরো পাহাড়ি জনপদ। ধোঁয়া আর রক্তের মধ্যে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ৩০ বছর বয়সী শ্রমিক আব্দুল খালেক। দুই পা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার। সহকর্মীরা ছুটে যেতে চাইলেও আতঙ্কে থমকে দাঁড়ান—কারণ আশপাশে আরও মাইন থাকতে পারে। পরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কয়েকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানেন তিনি। মঙ্গলবার বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের রেজু আমতলী সীমান্তের ৩৯ ও ৪০ নম্বর সীমান্ত পিলারের মধ্যবর্তী এলাকায় ঘটে এ মর্মান্তিক ঘটনা। স্থানীয়দের ধারণা, সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি এলাকায় আগে থেকেই পুঁতে রাখা অ্যান্টি-পার্সোনেল মাইনে পা পড়তেই ঘটে বিস্ফোরণ। আব্দুল খালেকের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ছড়িয়ে পড়া এক ভয়ংকর মানবিক বিপর্যয়ের নতুন অধ্যায়। * রক্তাক্ত সীমান্ত : মাত্র ১৬ দিনে ৫ জনের মৃত্যুঃ নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে গত কয়েক সপ্তাহ যেন মৃত্যুর উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। গত ২৪ মে তুমব্রু সীমান্তের ৪১ ও ৪২ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী এলাকায় একই দিনে প্রাণ হারান তিন পাহাড়ি শ্রমিক। নিহতরা হলেন অক্যমং তংচঙ্গ্যা (৪০), চিক্যং তংচঙ্গ্যা (৩৪) ও শৈফুচিং তংচঙ্গ্যা (৩২)। এরপর বাইশফাঁড়ি সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে মারা যায় এক কিশোর। সবশেষ মঙ্গলবার (৯ জুন) প্রাণ গেল আব্দুল খালেকের। স্থানীয় প্রশাসন, বিজিবি ও জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১৬ দিনের ব্যবধানে সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন। আহত হয়েছেন অন্তত চারজন। আর ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মাইন ও অবিস্ফোরিত গোলার বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। আহতের সংখ্যা ৪০ ছাড়িয়েছে। নিহতদের তালিকায় রয়েছেন কৃষক, শ্রমিক, কাঠুরে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সদস্য, রোহিঙ্গা শরণার্থী এমনকি বিজিবি সদস্যও।

* একজনকে বাঁচাতে গিয়ে নিভে যায় আরও দুই প্রাণঃ  ২৪ মে দুপুর। ভালুকিয়াপাড়া এলাকার কয়েকজন পাহাড়ি শ্রমিক সীমান্তঘেঁষা একটি কলাবাগানে কাজ করছিলেন। হঠাৎ বিস্ফোরণ। ঘটনাস্থলেই মারা যান অক্যমং তংচঙ্গ্যা। সঙ্গে থাকা চিক্যং তংচঙ্গ্যা ও শৈফুচিং তংচঙ্গ্যা বন্ধুকে উদ্ধার করতে ছুটে যান। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আরেকটি বিস্ফোরণ। এক মুহূর্তে নিভে যায় তিনটি জীবন। স্থানীয়দের ভাষায়, মৃত্যুকে বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যুরই শিকার হয়েছেন তারা। তিনজনই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাদের মৃত্যুর পর পরিবারগুলো এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। অক্যমংয়ের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট বাঁশের ঘরের এক কোণে এখনও ঝুলছে তার ব্যবহৃত কাপড়। স্ত্রীর চোখে তখনও শুকায়নি কান্না।

তিনি বলেন, সকালেও বলেছিল বিকেলে মাছ নিয়ে ফিরবে। জানতাম না এটাই শেষ কথা হবে। * পা হারিয়ে বেঁচে থাকা যেন আরেক মৃত্যুঃ  মাইন বিস্ফোরণে আহতদের জীবনও কম করুণ নয়। চাকঢালা সীমান্তে প্রায় দেড় বছর আগে মাইন বিস্ফোরণে পা হারান মো. জুবায়ের (৩৫)। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পরও তার পা বাঁচানো সম্ভব হয়নি। হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলতে হয়েছে। এখনও তিনি লাঠিতে ভর দিয়ে চলেন। জুবায়ের বলেন, অনেকে সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু আমার হারানো পা কি কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে? তার এই প্রশ্ন যেন সীমান্তের অসংখ্য আহত মানুষের আর্তনাদের প্রতিধ্বনি। * মৃত্যুর ফাঁদে বিজিবিওঃ মাইনের ভয়াবহতা থেকে রেহাই পাননি সীমান্তরক্ষীরাও। ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর তুমব্রু সীমান্তে টহলরত অবস্থায় মাইন বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হন কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের নায়েক মোহাম্মদ আক্তার হোসেন। বিস্ফোরণে তার একটি পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘ ১৯ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ৩১ অক্টোবর তিনি মারা যান। এ ঘটনার পর সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা ও মাইন ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। 


ad728

এ জাতীয় আরো খবর..

ad728
ad728